চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ স্থায়িত্বের দিক থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মোট সময়সীমাকেও ছাড়িয়ে গেছে। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর গত ১১ জুন এই যুদ্ধ এক নতুন ও দীর্ঘস্থায়ী মাইলফলক স্পর্শ করল।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই শুরু হওয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৫৬৭ দিন স্থায়ী হয়েছিল। অন্যদিকে, ইউক্রেন যুদ্ধ ইতিমধ্যে সেই সময়সীমা পার করে আজ পর্যন্ত ১ হাজার৫৭০ দিনে পদার্পণ করেছে। আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাত বিশ্বজুড়ে এক বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংঘাতের ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি ও আর্থিক বিপর্যয়
দীর্ঘস্থায়ী যেকোনো যুদ্ধের মতোই এই সংঘাতের সঠিক ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা কঠিন হলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার যৌথ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট সামগ্রিক আর্থিক ক্ষতি ও ব্যয়ের পরিমাণ ইতিমধ্যে ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় ধরনের সংকটের মুখে ফেলেছে।
আর্থিক ক্ষতির চেয়েও এই যুদ্ধে মানুষের প্রাণের ক্ষয়ক্ষতি আরও ভয়াবহ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসাব মতে, যুদ্ধে এ পর্যন্ত প্রায় ৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া আহত, বাস্তুচ্যুত ও নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা হিসাব করলে ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা ২০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে।
এই যুদ্ধের আঁচ লেগেছে বাংলাদেশেও। উন্নত জীবনের আশায় দালালের খপ্পরে পড়ে রাশিয়ায় যাওয়া অন্তত ৪০ জন বাংলাদেশি তরুণ ইউক্রেন ফ্রন্টে সম্মুখ যুদ্ধে বাধ্য হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
আড়ালে পড়েছে ইউক্রেন যুদ্ধ?
বিশ্লেষকরা বলছেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে যে নতুন যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা সাময়িকভাবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের আড়ালে ঠেলে দিয়েছে। তবে মাঠের লড়াই কিংবা কূটনৈতিক টানাপোড়েন—কোনোটিই থেমে নেই।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর এই যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক চেষ্টা চালালেও মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাত শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নিয়েছে।
জেলেনস্কির খোলা চিঠি ও পুতিনের প্রতিক্রিয়া
যুদ্ধ বন্ধের নানামুখী তৎপরতার অংশ হিসেবে গত ৪ জুন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে একটি খোলা চিঠি পাঠান। সেখানে তিনি সুইজারল্যান্ড বা তুরস্কের মতো কোনো নিরপেক্ষ দেশে পুতিনের সাথে সরাসরি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের প্রস্তাব দেন। ইউক্রেনের পশ্চিমা মিত্ররা এই প্রস্তাবকে সমর্থন করলেও এর সাথে কিছু শর্ত জুড়ে দেয়।
তবে ক্রেমলিন এই শর্তযুক্ত আলোচনার প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সামরিক অভিযানের মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলবে।
সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ইউক্রেনের অধিকাংশ সাধারণ নাগরিক মনে করছেন আগামী বছরের আগে এই সংঘাত থামার কোনো লক্ষণ নেই। ফলে যুদ্ধ এভাবে চলতে থাকলে এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্থায়িত্বের রেকর্ডকেও স্পর্শ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা।