এটা আমি কী করলাম—জর্ডানের ডিফেন্ডার ইয়াজান আল-আরব হয়তো এটা ভেবেই এখন কপাল চাপড়াচ্ছেন। সান ফ্রান্সিসকো স্টেডিয়ামে আজ যেখানে অস্ট্রিয়ার সঙ্গে দাপট দেখিয়ে খেলছিল জর্ডান, সেখানে আত্মঘাতী গোলটাই এগিয়ে দিয়েছে অস্ট্রিয়া। আর শেষ মুহূর্তে পেনাল্টি পেয়ে ব্যবধানটা আরও বাড়িয়ে ৩-১ গোলে জিতেছে ইউরোপের এই দল।
ম্যাচের শুরু থেকেই অস্ট্রিয়ার রক্ষণদুর্গে বারবার হানা দিতে থাকেন জর্ডানের ফুটবলাররা। ২ মিনিটে জর্ডান ডিফেন্ডার এহসান হাদ্দাদ ডান পায়ে শট নিলেও তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। ৯ মিনিটে দলটির ফরোয়ার্ড মুসা আল-তামারি ফের গোলের চেষ্টা করেন।
তবে তাঁর শট প্রতিহত করেন অস্ট্রিয়া গোলরক্ষক আলেক্সান্দার শ্লাগার। ১১ মিনিটে এরপর প্রতি আক্রমণে অস্ট্রিয়ার ডিফেন্ডার ডেভিড আলাবা গোলের চেষ্টা করেও সফল হননি।
১৭ মিনিটে জর্ডান ফরোয়ার্ড ওদাই আল-ফাখুরি অস্ট্রিয়ার লক্ষ্য বরাবর শট নিলেও তা প্রতিহত করেছেন অস্ট্রিয়া গোলরক্ষক আলেক্সান্দার শ্লাগার। আক্রমণ-প্রতি আক্রমণে প্রথম গোল করে অস্ট্রিয়া। ২১ মিনিটে জাভার শ্লাগারের অ্যাসিস্টে ডান পায়ের শটে লক্ষ্যভেদ করেন রোমানো শ্মিড।
জর্ডান এরপর সমতায় ফেরার প্রাণপণ চেষ্টা করলেও অস্ট্রিয়া গোলরক্ষক আলেক্সান্দার শ্লাগার বারবার তা ফিরিয়ে দিয়েছেন। আর প্রথমার্ধের শেষের দিকে এসে মুসা আল তামারি একাধিক গোলের সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাতে পারেননি।
কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামের দিনটি যেন আগে থেকেই শুধুই লিওনেল মেসির গল্প হয়ে থাকার জন্য নির্ধারিত ছিল। আলজেরিয়ার বিপক্ষে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার ৩-০ গোলের দাপুটে জয়ের পুরোটা জুড়েই তো রইলেন ৩৮ বছর বয়সী এই তারকা। গোল করলেন, করলেন হ্যাটট্রিক কে জানত ২০২৬ বিশ্বকাপে নিজের শুরুটা করবেন কেবল ইতিহাস আর ইতিহাস দিয়ে!
ম্যাচের শুরুতেই দুই দলের একটি করে গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হলে মাঠে কিছুটা নাটকীয়তার তৈরি হয়েছিল। তবে সেই আবহ বেশি সময় টেকেনি, কারণ ম্যাচের ১৬ মিনিটেই শুরু হয় মেসি জাদু। রদ্রিগো দে পলের পাস থেকে আলজেরিয়ার ডি-বক্সের ঠিক বাইরে বল পান আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। এরপর তাঁর সেই চেনা শরীরী মোচড়ে এক দুর্দান্ত টার্ন এবং বাঁ পায়ের জাদুকরী শটে বল পাঠান জালে।
এই চোখধাঁধানো গোলের মধ্য দিয়ে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর ইতিহাসের দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে পাঁচটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার অনন্য কীর্তি গড়েন মেসি।
প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল মেসির পায়েই। মাঝমাঠের সাধারণ কিছু আক্রমণ বাদ দিলে ম্যাচের ৬০ মিনিটে আবারও আলোর ঝলকানি দেখান তিনি। আলেক্সিস মাক আলিস্তারের নেওয়া একটি দূরপাল্লার জোরালো শট ঠিকমতো তালুবন্দী করতে পারেননি আলজেরিয়ার গোলরক্ষক লুকা জিদান। বল হাত থেকে ফসকে যেতেই সেখানে ওত পেতে থাকা মেসি চিতার গতিতে এক সহজ ট্যাপ-ইনে বল জালে জড়ান।
তবে মেসির রূপকথা তখনো শেষ হতে বাকি ছিল। ৭৬ মিনিটে মাঝমাঠ থেকে এক বিদ্যুৎগতির পাল্টা আক্রমণে বল নিয়ে ছুটে যান তিনি। সতীর্থের সঙ্গে চমৎকার এক ‘ওয়ান-টু’ করে আলজেরিয়ার রক্ষণভাগকে পুরোপুরি বোকা বানান। এরপর বক্সের বাইরে থেকে থেকে নিখুঁত এক শটে বল জালে পাঠিয়ে নিজের অবিস্মরণীয় হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন তিনি। গ্যালারিতে বসা লুকা জিদানের বাবা, ফরাসি কিংবদন্তি জিনেদিন জিদান তখন কেবল রুক্ষ মুখে মাথা নাড়ছিলেন। এই ঐতিহাসিক গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসার সর্বকালের সর্বোচ্চ ১৬ গোলের রেকর্ড ছুঁয়ে ফেলেন মেসি। শুদু তা–ই নয়, ষষ্ঠ বিশ্বকাপে এসে পেলেন প্রথম হ্যাটট্রিকের দেখা।
হ্যাটট্রিক উদযাপনের পর ৮০ মিনিটে যখন কোচ লিওনেল স্কালোনি মেসিকে মাঠ থেকে তুলে নেন, তখন পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে এই ফুটবল জাদুকরকে সম্মান জানায়। সাধারণ ফুটবলীয় লড়াই ছাপিয়ে এই ম্যাচটি তাই আর্জেন্টিনার জয়ের চেয়েও বেশি মনে থাকবে বিশ্বমঞ্চে মেসির আরেক মহাকাব্য হিসেবে
৫ মিনিটের সময় গোল পেয়ে উল্লাসে মেতেছিলেন লিওনেল মেসি। কিন্তু লাইনসম্যান অফসাইডের পতাকা তোলায় থেমে যায় উদযাপন। তবে রেকর্ড ভাঙা-গড়া যে মেসির কাছে খুবই সহজ, তাঁকে থামানোর সাধ্য কার! কানসাস সিটি স্টেডিয়ামে গোল বাতিলের ১২ মিনিট পর গোল করে ছুঁলেন ৬০ বছরের এক পুরোনো রেকর্ড।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে আজ ১৭ মিনিটে রদ্রিগো দি পলের কাছ থেকে বলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের কাটিয়ে লক্ষ্যভেদ করেন মেসি। গোলের পর এবার মেসিকে থামাবেন কে! জাদুকরী এই গোলের আর্জেন্টিনার তারকা ফরোয়ার্ডের বিশ্বকাপে গোল হলো ১৪। যার মধ্যে পাঁচটিই করেছেন বক্সের বাইরে থেকে। ফুটবলের পরিসংখ্যান নিয়ে কাজ করা অপ্টা জো নিজেদের অফিশিয়াল এক্স হ্যান্ডলে জানিয়েছে, ১৯৬৬ থেকে শুরু করে বক্সের বাইরে থেকে ৫ গোল করার কীর্তি মেসির পাশাপাশি রয়েছে ব্রাজিলের কিংবদন্তি রবার্তো রিভেলিনোর।
মেসির গোলে এগিয়ে থেকে বিরতিতে আর্জেন্টিনামেসির গোলে এগিয়ে থেকে বিরতিতে আর্জেন্টিনা
৬০ বছরের পুরোনো রেকর্ডের পাশাপাশি মেসি ১৬ জুন তারিখকেও এক বিন্দুতে মিলিয়েছেন। ২০০৬ সালের ১৬ জুন আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ অভিষেকে গোল করে আর্জেন্টিনার সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতার কীর্তি গড়েছিলেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ১৮ বছর ৩৫৭ দিন। প্রতিপক্ষ ছিল সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রো। ২০ বছর পর আরেক ১৬ জুন আর্জেন্টিনার হয়ে বয়স্ক গোলদাতা বনে গেলেন। কানসাস সিটিতে আলজেরিয়ার বিপক্ষে গোলের সময় মেসির বয়স ৩৮ বছর ৩৫৭ দিন। বাংলাদেশ সময় আর্জেন্টিনা-আলজেরিয়া ম্যাচ ১৭ জুন হলেও যুক্তরাষ্ট্রের হিসেবে ১৬ জুন হচ্ছে।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলছেন মেসি। একই সঙ্গে আর্জেন্টিনার জার্সিতে ডাবল সেঞ্চুরির কীর্তিও গড়লেন তিনি। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ২০০তম ম্যাচে গোল করে দলকে এগিয়ে নিলেন মেসি। প্রথমার্ধ শেষে আর্জেন্টিনা এগিয়ে ১-০ গোলে। এই গোলে মেসি ছুঁয়েছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকেও। মেসি, রোনালদো প্রত্যেকেই আলাদা পাঁচ বিশ্বকাপে গোলের কীর্তি গড়েছেন।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাট্রিক করে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলের মাইলফলকে ভাগ বসালেন লিওনেল মেসি। এর আগে ১৬ গোল করে এ রেকর্ড করেছিলেন মিরোস্লাব ক্লোসা। এখন যৌথভাবে ক্লোসার পাশে নাম লেখালেন মেসি।
বেশ কয়েকটি রেকর্ডের দ্বারপ্রান্তে থেকে বিশ্বকাপ খেলতে নেমেছিলেন লিওনেল মেসি। আলজেরিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে সর্বোচ্চ ষষ্ঠ আসর খেলার রেকর্ড গড়লেন তিনি।
সর্বোচ্চ গোলদাতা জার্মান তারকা মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করলেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
আরেকটু আগেই হ্যাটট্রিকটা পেতে পারতেন মেসি। আলজেরিয়া গোলরক্ষস লুকা জিদান দারুণ দক্ষতায় শট ঠেকিয়েছেন তার। তবে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকাকে বেশিক্ষণ আটকে রাখা গেল না। ৭৬ মিনিটে বক্সের বাইরে থাকা মাটি কামড়ানো জোরালো শটে আর্জেন্টিনা ও নিজের তৃতীয় গোলটি করলেন মেসি। যা বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ ২৭তম ম্যাচ খেলতে নেমে তার প্রথম হ্যাটট্রিক।
আর্জেন্টিনা-আলজেরিয়া ম্যাচের প্রথমার্ধেই রেকর্ডের পাতায় নাম লিখিয়েছেন লিওনেল মেসি। ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার হিসেবে ষষ্ঠ বিশ্বকাপে মাঠে নামার কীর্তি গড়েছেন তিনি। পাশাপাশি ম্যাচের মাত্র ১৬তম মিনিটের মাথায় আলজেরিয়ার জালে বল পাঠিয়ে নিজেকে নিয়ে গেলেন অনন্য উচ্চতায় পর্তুগিজ সুপারস্টার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর পাঁচ বিশ্বকাপে গোল করেছেন তিনি।
২০০৬, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২২ সালের বিশ্বকাপে গোল করেছেন মেসি। একমাত্র ২০১০ সালে কোনো গোল করতে পারেননি তিনি।
৩৮ বছর বয়সী এই তারকা ফুটবলার দলটির প্রাণভোমরা। দেশের জার্সিতে ২০০তম ম্যাচ খেলার এক অনন্য মাইলফলকও স্পর্শ করেছেন তিনি।
টানা ৫ বিশ্বকাপে গোলের রেকর্ড মেসির
শুরুতেই স্কোরশিটে নাম তুলেছিলেন রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নামা লিওনেল মেসি। আর্জেন্টাইন মহাতারকার সেই গোল অফসাইডে বাতিল হয়ে যায়। আলজেরিয়ার একটি গোলও একই ফল দেখেছিল।
তবে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে। ১৬ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া দুর্দান্ত শটে মেসিই এগিয়ে দিলেন আলবিসেলেস্তেদের।
কানসাস সিটিতে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমেছে আর্জেন্টিনা ও আলজেরিয়া। শুরু থেকেই দুই দল আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ শুরুর পর গোল পেতে বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি আর্জেন্টিনার। নিজের ২০০তম ম্যাচ খেলতে নেমে মেসি দেখালেন সেই চিরচেনা বাঁ পায়ের জাদু।
বলটি মিডফিল্ড থেকে বাড়িয়েছিলেন রদ্রিগো ডি পল। কিছুটা এগিয়ে গিয়ে ২৫ গজ দূর থেকেই মেসি শটটা নেন, আলজেরিয়ার গোলরক্ষক ও জিনেদিন জিদানপুত্র লুকা জিদান তাতে হাত ছুঁয়েছেন। কিন্তু মেসির দুর্দান্ত শট তাকে ফাঁকি দিয়ে জালে জড়ায়।